বেকারত্ব হল এখন দেশের বৃহৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক রোগ । ইংরেজি আনএমপ্লোয়মেন্ট (Unemployment) শব্দটি থেকে বেকারত্ব শব্দটি এসেছে। একজন মানুষ যখন তার পেশা হিসেবে কাজ খুজে পায় না তখন যে পরিস্থিতির হয় তাকে বেকারত্ব বলে।
বেকারত্বের কারণ:-
দ্রুত হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি:-
ভারতে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির দরুন যে হারে কর্মপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে সেই হারে কাজের সুযােগ বাড়ছে না। কাজের আশায় গ্রামাঞ্চল থেকে কমপ্রার্থীরা শহর অঞলে এসে ভিড় করছে এবং এজন্য শহরাঞলে কাজের জন্য কর্মপ্রার্থীদের চাপ বাড়ছে। অথচ সেই অনুপাতে কাজের সুযােগ বাড়ছে না। ফলস্বরূপ দেশে বেকারত্ব বেড়ে যাচ্ছে।
শ্লথ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি:-
স্বাধীনতার প্রায় ৭০ বছর পরেও ভারতের মতাে দেশে অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, যেমন—কৃষি, শিল্প, যােগাযােগ ও পরিবহণ ইত্যাদির বৃদ্ধির হার অত্যন্ত নিম্ন। ফলে এই সমস্ত ক্ষেত্রে নিয়ােগের হার অত্যন্ত কম যা বেকারত্বের সমস্যাকে ঘনীভূত করে তুলেছে।
অনুপযুক্ত প্রযুক্তি:-
ভারতে জনসংখ্যার আধিক্য হেতু উৎপাদন ব্যবস্থা শ্রমনির্ভর প্রযুক্তিসম্পন্ন হওয়া প্রয়ােজন। জনসংখ্যার হার দ্রুত বৃদ্ধির ফলে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাহিদা নিবারণের পক্ষে উৎপাদনের হার বৃদ্ধির প্রয়ােজনে মূলধন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কর্মসংস্থানের সুযােগ ক্রমশ ক্রমপ্রাপ্ত হয়ে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি ঘটায়।
শিল্প ক্ষেত্রে ব্যর্থতা:-
ভারতে শিল্প রুগ্নতা বেকারত্ব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে অভিহিত করা হয়। শিল্প ক্ষেত্রে সামগ্রিক ব্যর্থতাগুলি হলাে শিল্প রুগ্নতার কারণ। ১৯৯১ সালে ঘােষিত শিল্পনীতি শিল্পের বেসরকারীকরণ ও রুগ্ন শিল্পগুলিকে রুদ্ধ করার নীতি আমাদের দেশের কর্মসংস্থানের সুযােগ বৃদ্ধি ঘটাতে পুরােপুরি ব্যর্থ। অন্যদিকে, বিদায়নীতি (Exit Policy) অথবা স্বেচ্ছামূলক অবসর কর্মসূচি (Voluntory Retirement) কার্যকর হতে শুরু হওয়ায় বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে।
ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা:-
দেশের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষিত বেকারত্ব সৃষ্টির জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী। কারণ প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থায় হাজার হাজার স্নাতক বা উচ্চশিক্ষিত যুবক-যুবতী পাশ করে বেরােচ্ছে। তারা অধিকাংশই কাজের বাজারে উপযুক্ত নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কাজের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তারা কাজ পাচ্ছে না। বৃত্তিমূলক বা প্রযুক্তিগত শিক্ষার অভাবে এ ধরনের শিক্ষিত বেকারত্বের সংখ্যা উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সর্বোপরি স্বনির্ভর প্রকল্প রূপায়ণে ব্যর্থতা, আমূল ভূমিসংস্কার ও কৃষির পুনর্গঠনের অভাব, স্বচ্ছ কর্মসংস্থান নীতির অভাব, অটোমেশন ইত্যাদিকে বেকার সমস্যা বৃদ্ধির কারণ বলা যেতে পারে।
বেকারত্বের প্রতিকার:
সকল-সমস্যার মত বেকারত্বের প্রতিকার ও সম্ভব। ভারতের জনসংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে সরকারের পক্ষে সকলকে চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়। প্রাইভেট কম্পানি গুলি কম খরচে বেশি লাভ করতে চায় তাই তারা বেশি শ্রমিক ও কর্মচারী লাগানোর থেকে বিজ্ঞানের সাহায্যে কাজ করা কে শ্রেয় বলে মনে করে। এ কারণেই আমাদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই নির্ধারণ করতে হবে। হয় নিজেদের দেশে নয় বিদেশে শুরু করতে হবে ছোটখাটো ব্যবসা। এখন বহু জায়গায় এর জন্য ট্রেনিং দেওয়া হয়। সেরকম জায়গা থেকে ট্রেনিং নিয়ে আমাদের নির্ভীক হয়ে প্রাইভেট ফার্ম খুলতে হবে। সেখানে আরও কিছু লোককে চাকরি দেওয়ার অবকাশ থাকবে। আমরা যদি সেই ব্যবসায় সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করতে পারি। তবে ব্যবসা নিশ্চয় দাঁড়িয়ে যাবে এবং সেখান আরো বেশি সংখ্যক কর্মচারী নেওয়া যাবে।
এই সমস্যার আশু সমাধান কঠিন, আর সমস্যার সমাধান কেবল কিছু চাকরি সৃষ্টির সুযোগ করে দেওয়াতেই কখনো হতে পারে না। চাকরির প্রতি অত্যধিক নির্ভরতা কমিয়ে ছোট ছোট শিল্প, বাণিজ্যিক উদ্যোগে রক্ত হওয়ার প্রয়াস চালানো প্রয়োজন। এ উদ্দেশ্যে অবশ্য সরকার স্বয়ং-নিযুক্তি-প্রকল্পের মাধ্যমে উৎসাহী তরুণ তরুণীদের আর্থিক সাহায্য দানের চেষ্টা করছেন। কৃষি ক্ষেত্রে ও ভূমিহীন কৃষকদের হাতে জমি দিয়ে তাদের কাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য প্রয়াস চালানো হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে প্রয়োজন শিল্পক্ষেত্রে শুধু পুঁজি বাড়ানোর নতুন নতুন প্রয়াস না করে নতুন উৎপাদনমুখী পরিকল্পনার। পুঁজিনির্ভর অর্থনীতিতে ধনী ও মালিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষিত হয়, কিন্তু কর্মার্থী জনসাধারণ তাতে লাভবান হয় না। কর্মসংস্থানের সঙ্গে কর্মপ্রার্থী জনতার সমন্বয় ঘটানো সম্ভব পরিপূর্ণ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। কিন্তু ভারতে ব্যক্তিগত মালিকানা এবং সরকারী উদ্যোগের মিশ্র অর্থনীতি চালু আছে। সরকারী উদ্যোগেও পরিচালন ও পরিকল্পনাগত ত্রুটি থাকায় কাজের ক্ষেত্র বাড়ছে না, অথচ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক কমপিউটার ইত্যাদি প্রবর্তনের ফলে অনেক কর্মী ছাটাই হয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই অটোমেশনের বিরুদ্ধে জনমত এখনো প্রবল।
উপসংহার : বেকারত্ব একটি অভিশাপ। তাই এ সমস্যা থেকে উত্তরণে নিজেদেরকেই সচেষ্ট হতে হবে। বেকার যুবকদেরকে সমবায়ের মাধ্যমে সুসংগঠিত হতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে বর্তমানে মূলধনপ্রান্তি কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা শুধুই উদ্যোগের।
.jpeg)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন